
ফিফা আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের অভিযান শেষ হয়েছে তিন ম্যাচে তিন হার দিয়ে। মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০, সিঙ্গাপুরের কাছে ১-০ আর শেষ ম্যাচে স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২। তিন ম্যাচে হজম করা গোল ১৩টি।
এই ফল নিয়ে এখন সবার মুখে একটাই প্রশ্ন: সমস্যাটা আসলে কোথায়?
ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে হারটা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হারগুলোর একটি। বাংলাদেশ এর আগে আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৯ গোল খেয়েছিল ১৯৭৫ সালে হংকংয়ের কাছে, ১৯৭৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে এবং ১৯৮২ সালে ইরানের কাছে। এবার সেই তালিকায় নতুন নাম যোগ হলো ৪৪ বছর পর।
ম্যাচের নায়ক ইন্দোনেশিয়ার ১৯ বছর বয়সী স্ট্রাইকার মিচেল বেকার। যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ভার্মন্ট গ্রিন এফসির এই ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার তরুণ একাই করেছেন ৫ গোল। বাংলাদেশের রক্ষণ তাঁকে থামাতে পারেনি।
র্যাঙ্কিংয়ের হিসাবটা শুরু থেকেই বাংলাদেশের বিপক্ষে ছিল। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ইন্দোনেশিয়া ১১৮, মালয়েশিয়া ১৩৬ আর সিঙ্গাপুর ১৪৮তম। বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১।
তবে হার আর হারের ধরন এক জিনিস নয়।
সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে হারটা ছিল আগের মতোই। ছয় মাস আগে হ্যারিস স্টুয়ার্টের গোলে যেভাবে হেরেছিল, এবারও একই গোলদাতা, একই ব্যবধান। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে পুরো রক্ষণভাগই ভেঙে পড়েছিল। উইং দিয়ে একের পর এক আক্রমণ এসেছে, ফাইনাল থার্ডে পাসিং আর প্রেসিংয়ের গতির সামনে ডিফেন্ডাররা দিশা পাননি। গোলকিপার মেহেদী হাসান কয়েকটি ভালো সেভ করেছেন, কিন্তু একা কতটুকুই বা সামলানো যায়।
কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বাংলাদেশ খেলেছে খোলামেলা ফুটবল। বিশ্লেষকদের মতে, লো ব্লক বা মিড ব্লকে জমাট থেকে জায়গা বন্ধ করাই ছিল বুদ্ধিমানের কাজ। ৩-১ হয়ে যাওয়ার পরও কৌশল বদলাতে দেখা যায়নি।
কোচ টমাস ডুলির অবস্থানও এখন কঠিন। আসিয়ান কাপকে তিনি আগে থেকেই শেখার মঞ্চ হিসেবে দেখাচ্ছিলেন, অথচ অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া কয়েকটি ম্যাচ জেতার কথা বলেছিলেন। কোচ আর অধিনায়কের সুরে এই ফারাক মাঠেও ছায়া ফেলেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
অন্যদিকে সময় দেওয়ার পক্ষেও যুক্তি আছে। ডুলি দায়িত্বে এসেছেন কয়েক মাস হলো। আসিয়ানের আগে বিশ্বের সর্বনিম্ন র্যাঙ্কিংয়ের সান মারিনোকে তাদের মাঠে হারিয়ে শুরুটা ভালোই করেছিলেন। স্থিতিশীল একাদশ গড়তে সময় লাগে, আর সেই সময়টা তাঁকে দিতে হবে।
তবু সমর্থকেরা অপেক্ষা করতে রাজি হননি। ম্যাচের পরদিন বিকেলে বাফুফে ভবনের সামনে একদল সমর্থক কোচের পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভ করেছেন।
এর মধ্যে আরেকটি বিতর্কও ছড়িয়েছে। টুর্নামেন্ট শেষে সাদ উদ্দিন ও জুনিয়র সোহেল রানার একটি নাইট ক্লাবে যাওয়ার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দলের শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এবার আসল আলোচনায় আসা যাক: প্রবাসী ফুটবলার।
হামজা চৌধুরী দলে আসার পর থেকে বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে আশা বেড়েছিল অনেক। গত বছর দল হংকং ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে ভালো লড়েছে, ২২ বছর পর ভারতকে হারিয়েছে, গ্যালারিতে দর্শকও ফিরেছে। কিন্তু আসিয়ান কাপ দেখিয়ে দিল, শুধু প্রবাসীর ওপর ভর করে এগোনো যায় না।
প্রবাসীরা একেবারেই কাজে আসছেন না, এমনটা বলা ভুল হবে। ১৯ বছর বয়সী ফারহান আলী ওয়াহিদ, জাপানি প্রবাসী শুকি ইতোফুসা ও জিদান ইউসুফ মাঠে নিজেদের ছাপ রেখেছেন। বিশেষ করে ইতোফুসার গতি আর উদ্যম উইংয়ে নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
সমস্যা অন্য জায়গায়।
বর্তমান দলে প্রবাসী আছেন প্রায় ৯ জন। এর মধ্যে হামজা ছাড়া কেউ বড় কোনো লিগে খেলেন না। নতুন আসা খেলোয়াড়েরা দলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময়ও পান না, কেউ কেউ ক্যাম্পে এসে ফিটনেস ঠিক করেন। সাবেক ফুটবলারদের মতে, বাছাইয়ের সময় খেলোয়াড়ের যোগ্যতা, লিগের মান আর পারফরম্যান্স ঠিকমতো যাচাই করা হচ্ছে না।
মরক্কো আর ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণ অনেকেই দেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে মরক্কোর ২৬ জনের স্কোয়াডে ১৯ জনই ছিলেন প্রবাসী বা প্রবাসী-বংশোদ্ভূত। ইন্দোনেশিয়ার দলও এখন প্রায় পুরোটাই প্রবাসী-নির্ভর।
কিন্তু ওই দেশগুলোর প্রবাসীরা সাধারণত উচ্চমানের লিগে নিয়মিত খেলেন। সেখানেই বাংলাদেশের সঙ্গে ফারাক।
ঘরোয়া ফুটবলের চেহারা আরও হতাশাজনক। সারা দেশে নিয়মিত লিগ আর প্রতিযোগিতার অভাব, অনিশ্চিত সময়সূচি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা। আসিয়ান কাপের ম্যাচের একদিন আগেই চাঁদপুরের এক এবড়োখেবড়ো মাঠে মোহামেডানের ঘরোয়া লিগের ম্যাচ হয়েছে, যা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
যে দেশে খেলোয়াড় তৈরির ভিত এত নড়বড়ে, সেখানে বড় আসরে ভালো ফলের আশা করাটাই কঠিন।
তাহলে সামনে কী করা দরকার?
সাবেক খেলোয়াড়দের পরামর্শগুলো মোটামুটি এক জায়গায় এসে মেলে:
- অন্তত ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কয়েক সপ্তাহের ক্যাম্পে বড় টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি নয়
- সারা দেশে নিয়মিত লিগ, উন্নত মাঠ ও পরিকল্পিত ক্যালেন্ডার
- প্রবাসী ফুটবলার বাছাইয়ে কড়া মানদণ্ড
- খেলোয়াড়দের নিজেদের ফিটনেসের দায়িত্ব নেওয়া
আসিয়ান কাপের এই বিপর্যয় তাই শুধু একটি টুর্নামেন্টের ব্যর্থতা নয়। এটা বাংলাদেশের ফুটবলের একটা আয়না, যেখানে সাময়িক উচ্ছ্বাসের আড়ালে থাকা দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রবাসী ফুটবলার জাতীয় দলের শক্তি বাড়াতে পারেন, কিন্তু ভিত গড়ে দিতে পারেন না। সেটা গড়তে হবে দেশের মাটিতেই।
